[মোঃ রবিউল ইসলাম মিনাল: গোদাগাড়ী রাজশাহী জেলা প্রতিনিধি]:
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মাটিকাটা ইউনিয়নের উজানপাড়া গ্রামে মাদকের করাল থাবায় ধ্বংসের মুখে পড়ছে তরুণ ও যুবসমাজ। দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে ও গোপনে হিরোইনসহ বিভিন্ন মারাত্মক মাদকের রমরমা ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি মেম্বার মোঃ তোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে।
তোজাম্মেল হক মৃত আনারুল ইসলামের ছেলের
বিগত প্রায় ২৫ বছর ধরে এই অবৈধ মাদক কারবারের সাথে সরাসরি যুক্ত বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র।
এই মাদক সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য এতটাই বেড়ে গেছে যে, অতিষ্ঠ এলাকাবাসী প্রতিকার চেয়ে সম্প্রতি গণস্বাক্ষর সম্বলিত একটি লিখিত অভিযোগপত্র গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বরাবর ডাকযোগে প্রেরণ করেছেন। অভিযোগপত্রটি গত ২৯/০১/২০২৫ ইং তারিখে দাখিল করা হয়েছে (ডায়েরি নং-৫৬)।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মাদক ব্যবসার অবৈধ উপার্জনে রাতারাতি ফুলেফেঁপে উঠেছেন এই জনপ্রতিনিধি। অভিযোগ রয়েছে, পুসুন্ডা মৌজায় (জেএল নং-২২৩) প্রায় ১০-১১ বিঘা এবং জৈত জয়রামপুর মৌজায় (জেএল নং-২১৯) প্রায় ৩-৪ বিঘা বহুমূল্যবান জমি কিনেছেন তিনি। মেম্বার পদের দাপট ও অঢেল সম্পদের মালিক বনে যাওয়া এই তোজাম্মেল মেম্বারের মাদক সিন্ডিকেট এখন পুরো এলাকা জুড়েই বিস্তৃত।
তোজাম্মেল মেম্বারের এই বিশাল মাদক সাম্রাজ্য পরিচালনায় প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করেন তার চাচাতো ভাই মোঃ আলামিন (পিতা: মৃত নজরুল ইসলাম)। আলামিন মূলত চরাঞ্চল ও সীমান্ত এলাকা থেকে গোপনে মাদকের বড় বড় চালান সংগ্রহ করে এনে বিভিন্ন খুচরা বিক্রেতা ও মাদকসেবীদের কাছে পৌঁছানোর মূল দায়িত্ব পালন করেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেওয়া অভিযোগপত্রে তোজাম্মেল মেম্বার ও আলামিন ছাড়াও এই চক্রের আরও কয়েকজন সক্রিয় সদস্যের নাম উঠে এসেছে। তারা হলেন তোজাম্মেল মেম্বারের অপর ভাই মোঃ আব্দুল মতিন (পিতা: মৃত আনারুল ইসলাম), মোঃ আব্দুল্লাহ ও মোঃ রুহুল (উভয়ের পিতা: মোঃ রফিক)। এই পুরো সিন্ডিকেটটি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে মাদক ব্যবসা চালিয়ে আসছে।
আইনসংখ্যা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে বা মামলা হামলা থেকে বাঁচাতে তোজাম্মেল দীর্ঘদিন ধরে দালালি ও প্রভাবশালী মহলের আশ্রয় নিয়ে আসছেন। পূর্বে 'মফা কমিশনার' নামে এক ব্যক্তি থানার দালালি সামলাতেন, কিন্তু তিনি গ্রেপ্তার হয়ে জেলে যাওয়ার পর তোজাম্মেল মেম্বার নিজেই সেই স্থান দখল করেন। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রুহুল আমিনের সময়ে থানায় কোনো মাদকের চালান আটক হলে গোপনে রফাদফা ও মধ্যস্থতা করার মাস্টারমাইন্ড ছিলেন এই তোজাম্মেল।
বিচার শালিসে ঘুষ বাণিজ্য ও জুলুম নির্যাতনের কথা এসেছে
শুধু মাদক ব্যবসাই নয়, এলাকার গ্রাম্য বিচার শালিসেও একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে স্বৈরাচারী শাসন চালাচ্ছেন তোজাম্মেল মেম্বার। সালিশি বৈঠকে সুবিচারের নামে চলে টাকার খেলা। অভিযোগ রয়েছে, অন্যায় ও অবৈধ সুবিধা নিয়ে একপক্ষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা খেয়ে নিরীহ ও দুর্বল মানুষের ওপর অন্যায় রায় চাপিয়ে দেন তিনি। টাকা না দিলে কিংবা তার অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে ভাগ্যে জোটে শারীরিক নির্যাতন, হুমকি ও মিথ্যা মামলার ভয়ভীতি। ফলে তার বিচারে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন সাধারণ মানুষ।
নারী কেলেঙ্কারি ও সামাজিক অনাচার
মেম্বার পদের সুযোগ নিয়ে এলাকায় নানা অসামাজিক ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। উজানপাড়া ও আশপাশের এলাকায় তার বিরুদ্ধে একাধিক নারী কেলেঙ্কারির ঘটনা লোকমুখে ছড়িয়ে পড়েছে। অসহায় ও দরিদ্র পরিবারের নারীদের নানা সহায়তার প্রলোভন দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল ও অনৈতিক প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে এই প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে। তার এমন অনৈতিক চলাফেরায় চরম ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত স্থানীয় সচেতন মহল।
ভুক্তভোগীদের আকুতি ও চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উজানপাড়ার এক ভুক্তভোগী কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, তোজাম্মেল মেম্বার আমাদের পুরো গ্রামটাকে ছারখার করে দিচ্ছে। ঘরে ঘরে আজ হিরোইন পৌঁছে গেছে, আমাদের সন্তানরা চোখের সামনে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। কেউ প্রতিবাদ করতে গেলে সালিশের নামে উল্টো তার ওপর অত্যাচার চালানো হয়। একপক্ষের কাছ থেকে টাকা খেয়ে অন্যায় বিচার করাই তার কাজ।
অপর এক ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দা জানান, তোজাম্মেল মেম্বারের নামে এলাকায় কোনো নারী সুরক্ষিত নয়। মেম্বার হওয়ার পর থেকে তার অপকর্মের মাত্রা সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। থানায় দালালি আর মাদক বেচে সে এখন কোটিপতি, অথচ সাধারণ মানুষ তার ভয়ে টু শব্দটিও করতে পারে না। আমরা অবিলম্বে এই তোজাম্মেল ও তার ভাই আলামিনের গ্রেপ্তার চাই।
উল্লেখ্য, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেওয়া উক্ত অভিযোগপত্রের অনুলিপি অবগতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুলিশের আইজিপি, বিভাগীয় কমিশনার (রাজশাহী), ডিআইজি (রাজশাহী রেঞ্জ), জেলা প্রশাসক (রাজশাহী), পুলিশ সুপার (রাজশাহী) এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসার (গোদাগাড়ী) সহ বিভিন্ন দপ্তরে প্রেরণ করা হয়েছে।
মেম্বার পদের আড়ালে তোজাম্মেল ও তার সহযোগীদের এই বিষাক্ত মাদক ব্যবসা, ঘুষ বাণিজ্য এবং অনৈতিক অপকর্মের কারণে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে এলাকার অসংখ্য উঠতি বয়সের যুবক, নিঃস্ব হচ্ছে শত শত পরিবার। তোজাম্মেল মেম্বার ও তার ভাই আলামিন সহ পুরো চক্রের যাবতীয় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং অবৈধ সম্পদের সুষ্ঠু তদন্ত করে তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার জন্য সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, র্যাব ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের আশু ও জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করছেন ভুক্তভোগী উজানপাড়াবাসী।